ছোটবেলায় প্রায়ই ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া খামেনি যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আট ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন। তার বাবা সৈয়দ জওয়াদ খামেনি ছিলেন স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত একজন শিয়া পণ্ডিত, আর মা খাদিজে মির্দামাদী ছিলেন ধার্মিক ও প্রভাবশালী নারী। শৈশবে খামেনি মায়ের কাছ থেকে কুরআন ও ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন, যা তার ভবিষ্যতের জীবন ও চিন্তাধারার ভিত্তি স্থাপন করে। মায়ের তেলাওয়াতের কণ্ঠ ও শৈশবের নৈতিক শিক্ষা তার চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চার বছর বয়সে তিনি বড় ভাই মোহাম্মদের সঙ্গে স্থানীয় মক্তবে যোগ দেন। সেখানে শিক্ষকের কঠোর শাস্তিমূলক পদ্ধতির কারণে তিনি ভয় পেতেন। ছোটবেলা থেকেই খামেনি দারিদ্র্যের সংসারে বেড়ে উঠেন। ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমোতে যাওয়া, পুরোনো পোশাক এবং সহপাঠীদের কটাক্ষে তার শৈশব কঠিন ছিল। তবে এর মধ্যেও ছোটবেলা থেকেই তার একটি জুতা এবং সাধারণ জিনিসপত্রের প্রতি বিশেষ শখ ছিল, যা তার মনোযোগী ও সংবেদনশীল চরিত্রের পরিচায়ক।
প্রাথমিক শিক্ষার পর খামেনি স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হন, যেখানে দুর্বল দৃষ্টিশক্তির কারণে প্রথমদিকে তিনি ‘ভীষণ বোকা ও অলস ছাত্র’ হিসেবে পরিচিত হন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে চশমা ব্যবহার শুরু করেন এবং লেখাপড়ায় তার উজ্জ্বল প্রতিভা প্রকাশ পায়। বিদ্যালয়ের শীর্ষ মেধাবী শিক্ষার্থীর একজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার পরও, তার বাবা পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি বিরোধিতার কারণে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে দেননি। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তাকে শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমেতে পাঠানো হয়। কৈশোরে সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ জন্ম নেয়, বিশেষত উপন্যাস ও কবিতায়। কোমেতে যাওয়ার আগে তিনি প্রায় এক হাজারের বেশি উপন্যাস পড়েন, যার মধ্যে লিও টলস্টয়, ভিক্টর হুগো এবং রোমা রোলারের সাহিত্যকর্মও ছিল। সেই সময় তিনি ‘আমিন’ ছদ্মনামে কবিতা লেখা শুরু করেন।
১৯৫৫ সালে ছাত্র অবস্থায় খামেনি কোমের একটি সভায় যোগ দেন এবং সেখানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে পরিচিত হন। খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আন্দোলনে তিনি যুক্ত হন। কোমেতে পড়াশোনার সময় খামেনি তৎকালীন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেন এবং ১৯৬২ সালে খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। ধীরে ধীরে তিনি খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। বিপ্লবের আগ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক কার্যক্রম মূলত মাশহাদ শহরকেন্দ্রিক ছিল। ১৯৭৭ সালে তিনি সপরিবারে তেহরানে চলে যান এবং ওই বছরের ডিসেম্বরে গ্রেফতার এড়াতে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ সিস্তান ও বেলুচিস্তানে চলে যান। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি পুনরায় তেহরানে ফিরে বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) গঠনে সহায়তা করেন, যা পরবর্তীতে ইরানের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়।
১৯৮১ সালের জুনে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। এই হামলায় অংশগ্রহণের অভিযোগ ছিল বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। দুই মাস পর একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে। এরপর খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে মতবিরোধে জড়ান। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন।
১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। যদিও তিনি তখন ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জন করতে পারেননি, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তাকে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নিজের শাসনামলে খামেনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শৈশবের দারিদ্র্য ও শিক্ষার সীমাবদ্ধতা থেকে শুরু করে ইসলামি বিপ্লব ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব পর্যন্ত খামেনির জীবন জুড়ে সংগ্রাম, প্রতিরোধ এবং নেতৃত্বের অসামান্য গল্প লক্ষ্য করা যায়। তিনি শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি নিবেদিত ছিলেন, সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তার মৃত্যু সংবাদে বিশ্বের মনোযোগ আকৃষ্ট করে। তার জীবন ও কর্মকাণ্ড ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
