মূল জানাজার আগে গায়েবানা জানাজা আদায়: ইসলামে কি অনুমোদিত?”

 


সম্প্রতি মার্কিন ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকুস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এবং গায়েবানা জানাজা আদায় করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠেছে, মূল জানাজার আগে গায়েবানা জানাজা পড়া কি জায়েজ এবং এর ইসলামিক বিধান কী। এছাড়া কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সত্যিই গায়েবানা জানাজা বৈধ কি না’। বিষয়টি বিশ্লেষণ করে ইসলামি গবেষণা পত্রিকা ‘মাসিক আল কাউসার’ এবং সৌদি আরবভিত্তিক ফাতাওয়া ওয়েবসাইট ‘ইসলাম সওয়াল-জওয়াব’-এর আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

‘মাসিক আল কাউসার’-এ প্রকাশিত হয়েছে, জানাজা নামাজের সঠিকতা ও বৈধতার জন্য মৃত ব্যক্তির লাশ উপস্থিত থাকা আবশ্যক। অনুপস্থিত লাশের জন্য গায়েবানা জানাজা আদায়ের কোনো সুন্নাহসম্মত প্রমাণ নেই। নবীজী (সা.)-এর জীবদ্দশায় অনেক সাহাবি মদিনার বাইরে দূর-দূরান্তে শহীদ হয়েছেন। তবে এই শহীদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) গায়েবানা জানাজা পড়ার কোনো উদাহরণ বা প্রমাণিত ঘটনা নেই। বরং নবীজী সাহাবায়ে কেরামের জানাজা নামাজ পড়ার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের কেউ মারা গেলে আমাকে জানাবে। কারণ আমার জানাজা নামাজ মৃতের জন্য রহমত।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৩০৮৩)। তদ্রূপ, খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়েও দূর-দূরান্তে শহীদদের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদি এটি সুন্নাহসম্মত হতো, তাহলে সাহাবীগণ অবশ্যই তা পালন করতেন।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রাহ.) তাঁর গ্রন্থ ‘যাদুল মাআদ’-এ উল্লেখ করেছেন, অনুপস্থিত লাশের গায়েবানা জানাজা নামাজ নবীজীর সুন্নাহ ও আদর্শ ছিল না। বহু মুসলমান বিভিন্ন দূর-দূরান্তের স্থানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়েননি। এজন্য বর্তমান সময়ে অনুপস্থিত লাশের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়া সুন্নাহসম্মত নয় এবং সালাফের আমলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অতএব এটি বর্জনীয় প্রথা।

অনেকে নাজাশী (রা.)-এর জন্য নবীজীর জানাজার ঘটনা উদাহরণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পুরো বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যায়, নাজাশীর জানাজা বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নাজাশীর লাশ সম্ভাব্যভাবে নবীজীর সামনে উপস্থিত ছিল। মুসনাদে আহমদ ও সহিহ ইবনে হিব্বানের বর্ণনা অনুসারে, নবীজী (সা.) নিজে দাঁড়িয়ে জানাজা আদায় করেছেন এবং সাহাবীরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজে অংশ নিয়েছেন। এটি সাধারণ প্রথা নয়, বরং বিশেষ প্রয়োজনে সংঘটিত হয়েছিল।

আল্লামা যায়লায়ী, ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনুল কায়্যিম এবং আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, গায়েবানা জানাজা সাধারণ পরিস্থিতিতে সুন্নাহ নয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা অত্যাবশ্যক হলে এটি আদায় করা যেতে পারে।

সৌদি আরবভিত্তিক ফাতাওয়া ওয়েবসাইট ‘ইসলাম সওয়াল-জওয়াব’-এও বলা হয়েছে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ও ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এই বিষয়ে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, মৃত ব্যক্তি যদি ভিন্ন শহরে থাকে, তখন গায়েবানা জানাজা পড়া জায়েজ। কিন্তু শহরের মধ্যে বা লাশ উপস্থিত থাকা অবস্থায় গায়েবানা জানাজা জায়েজ নয়। মাইয়্যেতকে অবশ্যই উপস্থিত করতে হবে।

একইভাবে সৌদি আরবের ফাতাওয়া বোর্ড আল-লাজনাতুদ দায়িমা জানিয়েছে, মৃত ব্যক্তির গায়েবানা জানাজা সর্বাবস্থায় জায়েজ নয়। তবে যদি মৃত ব্যক্তির জন্য জানাজা নামাজ পূর্বে হয়নি, তবেই একবারের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়া জায়েজ। একবার জানাজা হয়ে গেলে আর গায়েবানা পড়া জায়েজ নয়।

বর্তমান সময়ে প্রখ্যাত মুফতি সালেহ আল উসায়মিনও এই মতের ওপরই ফাতাওয়া দিয়েছেন। অর্থাৎ মূল নীতি হলো, জানাজা নামাজের বৈধতা নিশ্চিত করতে লাশ অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। শুধুমাত্র বিশেষ প্রয়োজনে, যেমন দূর-দূরান্তে অবস্থানকারী মৃত ব্যক্তির জন্য, গায়েবানা জানাজা পড়া সম্ভব।

অতএব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকুসের গায়েবানা জানাজা কার্যক্রমকে সাধারণ প্রথার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এটি সুন্নাহসম্মত নয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে, মৃত ব্যক্তির জন্য যদি জানাজা আদায় করা সম্ভব না হয়, তখন এককালীন গায়েবানা নামাজের অনুমতি রয়েছে। সালাফী শিক্ষাবিদদের ব্যাখ্যা অনুসারে, এটি মূলত প্রয়োজনীয়তা ও অসুবিধার ভিত্তিতে সীমিত বৈধতা পায়।

সংক্ষেপে বলা যায়, গায়েবানা জানাজা সুন্নাহ হিসেবে স্বীকৃত নয়। তবে দূরবর্তী বা অনুপস্থিত মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ প্রয়োজনে একবার আদায় করা জায়েজ। মূল নিয়ম হলো, জানাজা নামাজের জন্য লাশ অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। ইসলামী বিধান ও সালাফের প্রথা অনুযায়ী, এটি বর্জনীয় হলেও প্রয়োজনে সীমিতভাবে অনুমোদনযোগ্য।

Next Post Previous Post